সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৩
অ-  অ+

পাচারের ওপর নির্ভরশীল স্বর্ণের বাজার

বেঙ্গলিনিউজটোয়েন্টিফোর.কম ডেস্ক


ঢাকা: গত দুই বছরে এক রতি সোনা আমদানিরও শুল্ক পায়নি সরকার। অথচ বাজারে সরবরাহে কমতি নেই। স্বর্ণালংকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের আট থেকে ১০ হাজার গয়নার দোকানে প্রতিদিন প্রায় ২৫ কোটি টাকার স্বর্ণালংকার কেনাবেচা হয়। এই বিপুল পরিমাণ সোনা কোত্থেকে, কীভাবে আসছে, তা নিয়ে কোনো জবাবদিহি নেই। নেই যথাযথ নজরদারি।সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে এ বছরের প্রথম আট মাসে (২০ আগস্ট পর্যন্ত) আটক হয়েছে ২৩৪ কেজির বেশি সোনা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও শুল্ক কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিদিনই সোনা চোরাচালানের ঘটনা ঘটছে। ধরা পড়ছে কালেভদ্রে।পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), গোয়েন্দা বিভাগ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও শুল্ক কর্মকর্তারা বলেছেন, সোনা চোরাচালানে বিমান ও বিমানবন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ সরাসরি জড়িত।তবে সোনা চোরাচালানে বিমানের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত আছেন কি না, সে ব্যাপারে মন্তব্য করতে চায়নি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, সোনা আমদানির ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, তা তাঁদের জন্য ‘জটিল’ ও ‘অলাভজনক’। এ কারণে তাঁরা অবৈধ পথে আসা সোনার ওপর নির্ভর করেন।দেশের আইন অনুযায়ী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে সোনার বার বা ‘বিস্কুট’ আমদানি করা যায়। তবে এ আমদানি বাবদ প্রতি ভরির দাম ৪০ হাজার টাকা ধরে (১১ দশমিক ৬৬ গ্রাম) এর ভ্যাট/ট্যাক্স দিতে হয় চার হাজার টাকার বেশি। ব্যবসায়ীদের দাবি, এই পরিমাণ ভ্যাট/ট্যাক্স দিয়ে গয়না আমদানি করে ব্যবসা করাটা অলাভজনক। তবে কোনো ব্যক্তি বিদেশ থেকে আসার সময় ২০০ গ্রাম সোনা বা সেই ওজনের সোনার গয়না সঙ্গে নিয়ে আসতে পারেন।
ঢাকা কাস্টম হাউসের শুল্ক কমিশনার জাকিয়া সুলতানা বলেন, গত দুই বছরে এক রতি সোনা আমদানিরও শুল্ক পায়নি সরকার। তবে ২০১৩ সালের ২০ আগস্ট পর্যন্ত ২১০ কেজি স্বর্ণ আটক করা হয়েছে শাহজালাল বিমানবন্দরে। ২০১২ সালে একই বিমানবন্দর থেকে পাঁচ কোটি টাকার সমপরিমাণ ১১ দশমিক ৬৯ কেজি সোনা উদ্ধার করেছিল শুল্ক কর্তৃপক্ষ। তিনি আরও জানান, উদ্ধার করা সোনা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়ে থাকে। চট্টগ্রাম শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার শফিউর রহমান জানান, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ বছরের জানুয়ারি থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত ২৪ দশমিক ৩৯ কিলোগ্রাম সোনা আটক করে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আমিনুল ইসলাম বলেন, পুরোনো গয়না, প্রবাসীদের কাছ থেকে পাওয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংক নিলাম করলে সেখান থেকে সোনা কেনেন তাঁরা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, বাংলাদেশের আট থেকে ১০ হাজার গয়নার দোকানে প্রতিদিন ২৫ কোটি টাকার কেনাবেচা হয়। এই পরিমাণ স্বর্ণালংকারের চাহিদা অন্যের গয়না ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিলাম থেকে মেটানো সম্ভব নয়।
সিআইডির কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বের অন্যান্য সোনার বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশে মূল্যের হেরফের তেমন নেই। সহজে বহন করা যায় বলেই পাচারকারীরা সোনাকে বেছে নেন। আর বাংলাদেশে খাদ মিশিয়ে গয়না তৈরি হওয়ায় লাভের পরিমাণ বেড়ে যায়।
কারা, কোত্থেকে কীভাবে আনছে: শাহজালাল বিমানবন্দরে সোনা পাচারের ঘটনার বেশ কয়েকটি মামলার তদন্তকারী সিআইডির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দুবাইয়ে বসবাসকারী কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি এ দেশে সোনা পাঠানোর কাজ করেন। সিঙ্গাপুর, দোহা, হংকংয়েও এই পাচারকারী চক্রের লোকজন অবস্থান করেন। মূলত এসব রুট থেকে যাত্রীকে দিয়ে টাকা অথবা বিমান টিকিটের বিনিময়ে কখনো ফুলদানির ভেতর, কখনো বা জুতার ভেতর ও কার্বন পেপারে সোনার বার এ দেশে পাচার করা হয়।
সূত্র জানায়, বিমানবন্দরে অস্থায়ী ভিত্তিতে যাঁরা কাজ করে থাকেন, তাঁরাই এসব সোনা উড়োজাহাজ থেকে নামানোর কাজ করেন। এরপর বোর্ডিং ব্রিজের পাশে টয়লেটে সোনা রেখে আসা হয়। আরেকটি দলের কাজ টয়লেট থেকে বিমানবন্দরের বাইরে সেগুলো নিয়ে আসা। অন্য একটি দল পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারসহ অন্যান্য স্থানে ক্রেতাদের কাছে সোনার চালান পৌঁছানোর কাজ করে থাকে। পরিশ্রমের টাকাও সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে নেয় তারা।
এপিবিএনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চোরাচালানের ঘটনায় বিমানের প্রকৌশলীরা জড়িত ছিলেন বলে তিনি মনে করেন। ওই ঘটনায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১২৪ কেজি সোনা উদ্ধার করেছিল শুল্ক কর্তৃপক্ষ। ওই সোনা পাওয়া গিয়েছিল গত ২৪ জুলাই নেপাল থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের ডিসি-১০ উড়োজাহাজের কার্গো হোলের একটা প্যানেল বক্সের ভেতর থেকে। তিনি বলেন, যাঁরা মালামাল ওঠানো-নামানোর কাজ করেন, তাঁদের পক্ষে ওই প্যানেল বক্সের ঢাকনা (শিট) খুলে রাখা সম্ভব নয়। এটি সম্ভব শুধু প্রকৌশলীদের পক্ষে।
মামলা হয় না, হলেও আসামি বেরিয়ে যায়: হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত ২৪ জুলাই ১২৪ কেজি সোনা উদ্ধার করেছিল শুল্ক কর্তৃপক্ষ। তবে এখনো পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। ধরাও পড়েনি জড়িত কেউ। গত ছয় মাসে বিমানবন্দরে উড়োজাহাজে কিংবা বন্দরের ভেতরে বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত অবস্থায় একাধিকবার বিপুল পরিমাণ সোনা উদ্ধার করেছে শুল্ক কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এসব ঘটনায় শুধু বিভাগীয় মামলা হয়।
এ বিষয়ে ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘বিমান কর্তৃপক্ষ কেন এ ঘটনায় মামলা করেনি? উড়োজাহাজের কার্গো হোলের ভেতরে তো কাস্টমের কেউ যেতে পারেন না। কোনো ব্যক্তিকে আমরা শাস্তি দিতে পারি না।’
বিমান কর্তৃপক্ষ বলছে, ঘটনা ঘটলে তারা তদন্ত কমিটি করে। ১২৪ কেজি সোনা উদ্ধারের ঘটনায় বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষ একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান আহ্বায়ক বিমানের মহাব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা) এম এ মোমিন প্রথম আলোকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত হচ্ছে। হয়তো আরও কিছুদিন পর প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হতে পারে।
পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ বছরের জানুয়ারি মাসে সাত কেজি সোনাসহ ধরা পড়েছিলেন মো. শফিক নামের একজন। বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫ এর (খ) ধারা অনুযায়ী সোনা চোরাচালানির সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কিন্তু শফিক তিন মাস ছয় দিন জেল খেটে বেরিয়ে গিয়ে আবার চোরাচালানিতে যুক্ত হয়েছেন বলে পুলিশের কাছে তথ্য আছে।
অভিযোগ বিমানকর্মীরা জড়িত: কাস্টম কর্মকর্তারা বলেছেন, ১২৪ কেজি সোনা পাচারের ঘটনায় বিমানের কর্মীরা অবশ্যই জড়িত রয়েছেন। ২৪ জুলাই দুপুরে কাঠমান্ডু থেকে ঢাকায় ফেরে বিজি ৭০২ উড়োজাহাজটি। এর আগে ২৩ জুলাই রাতে উড়োজাহাজটি দুবাই বিমানবন্দর ছেড়ে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকায় এসে পৌঁছায় ২৪ জুলাই সকাল আটটায়। ওই দিন সকালেই সেটি সিলেট হয়ে কাঠমান্ডু যায়। ২৪ জুলাই বেলা পৌনে দুইটার দিকে উড়োজাহাজটি ঢাকায় ফিরে আসে।
কাস্টম কর্মকর্তারা বলছেন, সোনার চালানটি বিমানের বডির ফাঁপা অংশে বিশেষভাবে ১৫টি প্যাকেটে রাখা ছিল। বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীদের সহায়তা ছাড়া আর কারও পক্ষে এত বড় চালান সেখানে রাখা সম্ভব নয়। এ ঘটনায় বিমানের কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয় বিমানের মহাব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা) এম এ মোমেনকে প্রধান করে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে। তবে কমিটি এখনো এ ঘটনায় কাউকে শনাক্ত করেনি বলে মোমেন প্রথম আলোকে জানান।
অন্য সংস্থার কর্মকর্তারাও আছেন!: গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর সাড়ে ১৩ কেজি সোনাসহ মনোয়ারুল হক নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ। মনোয়ারের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুরান ঢাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ী দেবু ও সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তাকর্মী আবুল কালামকে গ্রেপ্তার করে তদন্ত সংস্থা ডিবি। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে বিমানবন্দরে কর্মরত জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মাঠ কর্মকর্তা আবদুল আজিজ শাহ, সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তা অপারেটর রেখা পারভিন, নিরাপত্তা সুপারভাইজার আলো, নিরাপত্তারক্ষী লাভলী, মোতালেব খানসহ কয়েকজনের নাম উঠে আসে। এরপর আজিজ শাহ, সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তাকর্মী কবির আহমেদ, মোরশেদ আলম নামের এক চোরাকারবারি ও তাঁর গাড়িচালক হেলাল মিয়াকেও গ্রেপ্তার করে ডিবি। তবে এঁদের অনেকে এখনো পলাতক।
এর আগের ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে ডিবি সূত্রগুলো জানায়, বিমানবন্দরের বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে একটি চক্র নগদ টাকা দুবাই ও সিঙ্গাপুরে পাঠায়। সেই টাকায় স্বর্ণ ও ইলেকট্রনিকস দ্রব্যাদি কিনে আবার চোরাই পথেই (ঘোষণা ছাড়া) বাংলাদেশে পাঠানো হয়। এর সঙ্গে মানি এক্সচেঞ্জ, স্বর্ণকার ও ইলেকট্রনিকস ব্যবসায়ীদেরও যোগসাজশ রয়েছে। বিমানবন্দরের ভেতরে মানি এক্সচেঞ্জের কর্মীরা নগদ টাকা তুলে দেন সিভিল এভিয়েশনের কর্মীদের হাতে।
এরপর সিভিল এভিয়েশনের কর্মীরা বোর্ডিং ব্রিজ এলাকায় গিয়ে সুযোগ বুঝে উড়োজাহাজের নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা যাত্রীর হাতে মুদ্রার প্যাকেট তুলে দেন। এই টাকাটা আসে স্বর্ণ বা ইলেকট্রনিকস ব্যবসায়ীদের লগ্নি থেকে। আবার ফিরতি পথে সোনা বা ইলেকট্রনিকস দ্রব্যাদি আনার সময় সাহায্য নেওয়া হয় গোয়েন্দা সংস্থার কর্মীদের। যাত্রীরা বিমানবন্দরের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় ওই সব মালামালের প্যাকেট রেখে যান। তারপর বিভিন্ন সংস্থার কর্মীরা সেগুলো বিমানবন্দরের বাইরে বের করে দেন।
এ রকম মুদ্রা বহনের সময়ই গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় আড়াই কোটি টাকা মূল্যমানের বিভিন্ন দেশের মুদ্রাসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কামরুন্নাহার নামের এক বিমানবালা। তাঁর কাছে গ্রেপ্তারের চার দিন আগে (২৫ সেপ্টেম্বর) দুবাইয়ের আজমি জুয়েলার্স থেকে সোনার ১০টি বার কেনার রসিদ পাওয়া যায়।
তবে শাহজালালে কর্মরত এপিবিএনের একজন কর্মকর্তা বলেন, গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর এপিবিএনের যে কর্মকর্তা সোনার চালানটি ধরেছিলেন, তাঁকে বিমানবন্দর থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার চাপের মুখে ওই কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
প্রতিটি চোরাচালানের সঙ্গে বিমানবন্দরে কর্মরত কোনো না কোনো সংস্থার কর্মকর্তা বা সদস্যরা জড়িত থাকেন। পরে এগুলো ভালোভাবে তদন্তও করতে দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ করেন ওই কর্মকর্তা।প্রথম আলো
আইএম

এ সংশ্লিষ্ট আরো খবর :-
Top